2.9 C
New York
Saturday, December 5, 2020
Home জাতীয় ঘুরে দাঁড়িয়েছে এশিয়ার অর্থনীতি উল্টোরথে পশ্চিমা দেশগুলো

ঘুরে দাঁড়িয়েছে এশিয়ার অর্থনীতি উল্টোরথে পশ্চিমা দেশগুলো

নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত মহামারীর দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতির দেশগুলো। এশীয় এসব দেশ এরই মধ্যে মন্দার আশঙ্কা কাটিয়ে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরে এসেছে। তবে নিজস্ব অর্থনীতিতে বিশ্বের অন্যান্য স্থানে চলমান মহামারীর প্রকোপের ধাক্কা সামলানোটাই এ মুহূর্তে দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এশীয় অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ালেও ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতি চলছে এর বিপরীত দিকে। সংক্রমণের মাত্রা ভয়াবহ আকারে বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব দেশের কোনো কোনোটিতে এরই মধ্যে পুনরায় লকডাউন আরোপ করা হয়েছে। দীর্ঘায়িত হয়ে উঠেছে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা।

চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) জাপানের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে আগের প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) তুলনায় ৫ শতাংশ। অন্যদিকে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতিতে সংকোচনের পরিসংখ্যান সংশোধন করে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগের এক প্রতিবেদনে ওই সময়ে ৮ দশমিক ২ শতাংশ হারে সংকুচিত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল। অন্যদিকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে প্রবৃদ্ধির মাত্রা দাঁড়িয়েছে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে।

অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের ওপর নিক্কেই পরিচালিত এক জরিপ প্রতিবেদনের প্রক্ষেপণ ছিল, জাপানে এবার আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ২ শতাংশ। এক বছরের হিসেবে এ প্রক্ষেপিত হার ছিল ১৮ শতাংশ। সে হিসেবে গত প্রান্তিকে দেশটির অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স ছিল প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি ভালো। প্রকৃতপক্ষে প্রান্তিক ও বার্ষিক হিসেবে জাপানের অর্থনীতি সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যে হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির ইতিহাসে রেকর্ড।

জাপানের পরিসংখ্যান কয়েক ঘণ্টার মাথায় বেইজিংও চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। এতেও দেখা যায়, চীনের অর্থনীতি করোনার ধাক্কা কাটিয়ে গতিশীলতা বজায় রেখেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে গত মাসে শিল্পোৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। দেশটির শিল্পোৎপাদনের এ গতি বৈশ্বিক আর্থিক তথ্যসেবাদাতা প্রতিষ্ঠান রেফিনিটিভের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি। অন্যদিকে রয়টার্সের এক বিশেষজ্ঞ জরিপে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল দেশটিতে অক্টোবরে শিল্পোৎপাদন বৃদ্ধির হার দাঁড়াতে পারে সাড়ে ৬ শতাংশ।

শুধু শিল্পোৎপাদন নয়, দেশটির ভোক্তা চাহিদাও এখন গতিশীল হয়ে উঠেছে। অক্টোবরে দেশটিতে খুচরা বিক্রির পরিমাণ বেড়েছে ৪ শতাংশ। মাসভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, অক্টোবরেই দেশটিতে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি বেড়েছে সবচেয়ে বেশি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে মহামারীর কারণে স্থবির হয়ে পড়েছিল চীনের অর্থনীতি। এ পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গিন করে তোলে রফতানি খাতের ধস। বর্তমানে সে পরিস্থিতি কাটিয়ে চমত্কারভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশটি। বর্তমানে চীন মহামারীকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে এনেছে। ভোক্তারাও এখন বাজারে তাদের অবদান রাখছেন আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দেশটিতে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের গতি বেড়েছে।

জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে চীনের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এর আগে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ হার ছিল ৩ দশমিক ২ শতাংশ। বছরের চতুর্থ প্রান্তিকে দেশটির অর্থনীতি আরো অনেক বেশি গতিশীল হয়ে উঠবে বলে সর্বশেষ মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রকাশের সময় এক ব্রিফিংয়ে চীনের ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস ব্যুরোর মুখপাত্র ফু লিংহুই জানিয়েছিলেন। মূলত সেবা খাতের দ্রুত বর্ধনশীলতাকে কাজে লাগিয়েই চীনা অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে সে সময় অভিমত দিয়েছিলেন তিনি।

এশিয়ার আরেক বড় অর্থনীতি দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতিতে গত প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির হার তেমন একটা বড় না হলেও তাতে মহামারীর প্রভাব কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে পুরোপুরি। এর আগে টানা দুই প্রান্তিকে সংকোচনের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় মন্দার শিকার হয় দেশটির অর্থনীতি। মূলত গাড়ি ও মেমোরি চিপ রফতানি বেড়ে যাওয়াকে কাজে লাগিয়েই গত প্রান্তিকে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে দক্ষিণ কোরিয়া।

বিশ্বব্যাপী মহামারীর ব্যাপক প্রকোপের মধ্য দিয়েও নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারায় বেশ প্রশংসিত হয়েছে ভিয়েতনাম। এ সময় দেশটি শুধু মহামারীকে নিয়ন্ত্রণে আনেনি, একই সঙ্গে অর্থনীতির পতনও ঠেকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হলেও মন্দার শঙ্কায় পড়তে হয়নি দেশটিকে। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে দেশটিতে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

দীর্ঘায়িত মহামারীর অভিঘাত সামলে এশিয়ার অর্থনীতি যখন ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, ঠিক তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে পশ্চিমের দেশগুলোয়। ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের দেশগুলোয় এখন মহামারীর প্রাদুর্ভাব আবার বাড়ছে। এটিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পুনরায় লকডাউনসহ নানা বিধিনিষেধ আরোপ করতে বাধ্য হয়েছে দেশগুলোর সরকার।

কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে তছনছ হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ কোটি ডলারের প্রণোদনা দিয়েও দেশটির অর্থনীতিকে প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারছে না ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল গত সপ্তাহেই জানিয়েছেন, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরো প্রণোদনা ঘোষণা করা প্রয়োজন।

এদিকে চলতি মাসের শুরুর দিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড জানিয়েছে, মন্দা কাটিয়ে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও ব্রিটিশ অর্থনীতিতে আবারো মন্দায় পড়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশব্যাপী পুনরায় লকডাউন ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে এ আশঙ্কা প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অক্সফোর্ড ইকোনমিক্সের হেড অব এশিয়া ইকোনমিক্স লুই কুইজস সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে বলেন, উল্লেখযোগ্যমাত্রায় এবং ভালোভাবে ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারার কারণেই এশিয়ার অধিকাংশ দেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে।

তিনি মনে করছেন, করোনা সংক্রান্ত নতুন বিধিনিষেধের কারণে চলতি প্রান্তিকে ইউরোপ মহাদেশের অধিকাংশ দেশেরই অর্থনীতি সংকুচিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে লকডাউন ঘোষণা করা না হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে মার্কিন অর্থনীতিও।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ মুহূর্তে এশিয়ার দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতির চলমান অগ্রগতির ধারাকে বহাল রাখতে পারা। ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের বড় ব্যবসায়িক অংশীদার দেশগুলোর অর্থনৈতিক শ্লথতা ও স্থবিরতার কারণেই এশিয়ার দেশগুলোকে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে।

এইচএসবিসির এমডি এবং এশিয়ান ইকোনমিক রিসার্চের যুগ্ম প্রধান ফ্রেডরিক নিউম্যানের মতে, ইউরোপে নতুন করে লকডাউন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শ্লথতার কারণে এশীয় দেশগুলোর রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোয় চাহিদা শ্লথতার কারণে রফতানিনির্ভর এশীয় অর্থনীতিতে ঝুঁকি রয়েই গিয়েছে।

তিনি বলেন, এশিয়ার একার পক্ষে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

রেমিট্যান্সের প্রণোদনায় শর্ত শিথিল

একবারে পাঁচ লাখ টাকার বেশি রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রণোদনার ক্ষেত্রে শর্ত শিথিল করলো বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে রেমিট্যান্স প্রেরণকারীর পরিবর্তে এখানকার সুবিধাভোগী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা...

করোনার কয়েক কোটি টিকা সরবরাহ করবে চীন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি ডোজ করোনার টিকা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন। বর্তমানে দেশটিতে চারটি প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি টিকা তৃতীয় ধাপের পরীক্ষায় রয়েছে।এর মধ্যে এগিয়ে...

বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে: যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মিলার

বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য সহযোগিতা বৃদ্ধি, কভিড-১৯ মহামারি এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহযোগিতার সম্পর্ক অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার।সংবাদপত্রের সম্পাদকদের...

পাঁচ মাসে প্রবাসী আয় এক হাজার কোটি ডলার

অক্টোবরের তুলনায় সামান্য কম হলেও প্রবৃদ্ধির দিক থেকে রেকর্ড করেই চলেছে প্রবাসী আয়। অক্টোবর মাসে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছিলো ২১১ কোটি ২৪ লাখ...

Recent Comments